তোমায়
<3 Inbox গল্প <3
<3 Inbox গল্প <3
লিখেছেন-মোঃ নাজমুস সাফিন
মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কিছু কষ্ট আছে যা হাজার দীর্ঘশ্বাস ফেললেও বেরিয়ে যায় না;বুকের ভেতর জমে থাকে।রফিকের কষ্টটাও বোধহয় সেরকম।কান্নার মত বৃষ্টি ঝরছে।নীলা অনেক বৃষ্টি ভালোবাসে।যখনই বৃষ্টি হত নীলার প্রাণপন চেষ্টা থাকত রফিককে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে।রফিক ভিজতে চাইত না।বৃষ্টি তার ভালো লাগত না।তবুও নীলা জোর করে তার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজত।আজও হয়ত নীলা বৃষ্টিতে ভিজছে।কিন্তু রফিকের হাত ধরে নয়,অন্য কারও হাত ধরে।যাকে আজ রাতে সে বিয়ে করেছে।ভাবতে গিয়ে রফিকের বুকের ভেতরে কষ্টটা আরও বেড়ে গেল।তার চোখ পোড়াতে লাগল-আসলেই,কী পেলাম আমি এই জীবনে?যাকে নিজের চাইতেও বেশী ভালোবাসলাম তাকে পেলাম না।সে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেল।একটা ছোট চাকরি জোগাড় করতে পারলেই বোধহয় আজ মেয়েটা আমার পাশে থাকত।তাও পারলাম না।মেয়েটা বোধহয় অনেক বাস্তববাদী।কিন্তু আমি তো বাস্তববাদী না।তাই যখন মেয়েটা পরম নির্ভরতার সাথে অন্য কারও বুকে মাথা রাখবে,আর সে ভালোবাসার অজুহাতে মেয়েটাকে স্পর্শ করবে;তা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হবে না।আমি বড় দুর্বল মানুষ।আমার মত দুর্বল মানুষের এই বাস্তব পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না।আমার এই জীবন আর ভালো লাগে না।তাই আজ বৃষ্টির রাতে এ জীবন শেষ করে দিবো।অন্য এক জীবনে চলে যাব;যে জীবনে এ রকম দুঃখ-কষ্ট আমাকে জড়িয়ে রাখবে না।
চোখ মেলে রফিক হতচকিত হয়ে গেল।তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।চারিদিকে চোখ ধাধানো আলো।চোখে সয়ে নিতে তার কিছুক্ষণ লাগল।রফিক মুগ্ধ হয়ে চারিদিক দেখছে।সে কিছুই বুঝতে পারছে না।সে কোথায় আছে?চারিদিকে এক অদ্ভুত আলো ছেয়ে আছে।এতই সুন্দর আলো;যা তার বর্ণনা করার ক্ষমতা নেই।রফিক বুঝতে পারছে না সে কী করবে।সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তার কিছুই করার নেই।রফিক ভীত পায়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।সে মনে করতে চেষ্টা করছে তার সাথে কী হয়েছে।কিছুই মনে করতে পারল না।শুধু মাথায় আসছে-সে এক অসহনীয় ব্যথা অনুভব করছিল।অসহ্য এক যন্ত্রণা!কিন্তু হঠাৎ করে সব যন্ত্রণা-কষ্ট কমে যেতে শুরু করল।দেহে গভীর অবসাদ ভর করল।তারপর থেকে সে এখানে।জায়গাটা বড় নীরব।হালকা শীতল বাতাস বইছে।আশেপাশে কেউই নেই।রফিক আরও এগিয়ে যেতে লাগল।তার সামান্য ভয় ভয় করছে।হঠাৎ সে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল।দেখতে পেল দূরে বসে একটি মেয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।রফিক মেয়েটির কাছে গেল।সে কী জিজ্ঞেসা করবে মেয়েটি কাঁদছে কেন?কান্না তো সম্পূর্ণ নিজস্ব একটা ব্যাপার,তার কারণটাও অবশ্যই নিজস্ব।মেয়েটার নিজস্ব ব্যাপারে হঠাৎ জিজ্ঞেসা করা কী ঠিক হবে?রফিক তবুও কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেসা করল-কাঁদছ কেন?কথাটি শুনে মেয়েটি চোখ তুলে তাকালো।তার টলটলে চোখ পূর্ণ করে হতাশার ছায়া।সেই চোখে সামান্য ভয়ও কাজ করছে।মেয়েটি কথাটির জবাব দিল না।কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য সে এখন আর কাঁদছে না।রফিক সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটির পাশে বসল।তাতে মেয়েটি কিছুই বললো না।রফিক জবাব না পাবার আশায় জিজ্ঞেসা করল-আমি এখানে কেন?
তখন মেয়েটি নির্লিপ্ততার সাথে বললো,"তুমি বোধহয় মারা গিয়েছ,তাই এখানে।"
রফিকের মনে হল সে ভুল শুনেছে।মারা গিয়েছি মানে?এই মেয়ে বলছে কী!সে অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো।মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে তার মারা গিয়ে এখানে আসাই স্বাভাবিক,না মারা গেলে বরং আরও খারাপ দেখাবে।রফিকের হঠাৎ নীলার কথা মনে পড়ল।মনে পড়ল সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আত্মহত্যা করবে।আত্মহত্যা করার জন্য সে এক বোতল বিষ খেয়েছিল।তারপরই সে অসহনীয় যন্ত্রণাটা শুরু হল।তাহলে কী সে সত্যিই মারা গিয়েছে?তার ব্যাপারাটা বিশ্বাস হতে চাইল না।সে মেয়েটিকে জিজ্ঞেসা করল,"আচ্ছা,এই জায়গাটা কী?তুমি কিভাবে জানলে আমি মারা গিয়েছি?"
মেয়েটি||এই জায়গাটা কী আমি নিজেও জানি না।আর তুমি মারা গিয়েছ জানলাম কারন আমি নিজেও মারা গিয়েছি।মারা যাবার পর এখানে এসেছি।যাই হোক,তুমি মারা গেলে কীভাবে?
রফিক ইতস্তত করে বলল,''আমি বোধহয় আত্মহত্যা করেছি।বিষ খেয়েছিলাম।''
মেয়েটি||আত্মহত্যা করেছ!আত্মহত্যা করা কী ঠিক?
রফিক||না,ঠিক না।কিন্তু আমার এই কাজটা করা ছাড়া উপায় ছিল না।
মেয়েটি||কেন?কী হয়েছিল?
রফিক||আমি একটি মেয়েকে অনেক ভালোবাসতাম।কিন্তু মেয়েটি আমাকে ছেড়ে চলে গেল।অন্য একজনকে বিয়ে করল।তখন আমার মনে হল এই জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
মেয়েটি||আমি কীভাবে মারা গেলাম জানো?
রফিক||কীভাবে?
মেয়েটি||ক্যান্সারে।দীর্ঘ চার বছর ক্যান্সারে ভুগেছি।খুব কষ্ট হত।বর্ণনা করা যায় না এমন কষ্ট।বারবার মনে হত আমি মরে যাই না কেন?কিন্তু যখন মরে যেতে লাগলাম তার আগ মূহূর্তে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম আমি যেন আরো এক মূহূর্ত বেঁচে থাকি।এক মূহূর্ত।মামণি আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদছিল।ইচ্ছে করল মামণিকে আর এক মূহূর্ত জড়িয়ে রাখি।বেঁচে থাকতে খুব ইচ্ছে করছিল।আর তুমি এখানে আত্মহত্যা করলে।কী অদ্ভুত,তাই না?
রফিক দেখতে পেল মেয়েটা চোখের পানি মুছছে।স্বাভাবিক হয়ে কিছুক্ষন পর আবার জিজ্ঞেসা করল,''তোমার ভালোবাসার মানুষ তোমাকে ছেড়ে চলে গেল কেন?''
রফিক||আমি অনেক অর্থকষ্টে ছিলাম।কোনো চাকরিও ছিল না।মেয়েটা বোধহুয় আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিল।তাই একদিন হঠাৎ দূরে চলে গেল।
মেয়েটি||তুমি তাকে কিছুই বললে না?
রফিক||কী বলব?
মেয়েটি||বলতে তুমি তাকে কতটা ভালোবাসো?
রফিক||বলতে চেয়েছিলাম।কিন্তু বলতে পারলাম না।কেন বলতে পারলাম না তাও জানি না।মানুষের জীবন এত অদ্ভুত কেন?আমরা কোনো একজনের জন্য নিজের মাঝে এক জগৎ ভালোবাসা নিয়ে বসে থাকি।কিন্তু সেই ভালোবাসা তাকে কখনও দেখাতে পারি না।
মেয়েটি চুপ করে রইল।এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় তার কাছেও নেই।রফিক জিজ্ঞেসা করল,''তুমি বসে বসে কাঁদছিলে কেন?''
মেয়েটি||আমি মারা যাবার পরেই অনেক সময় হল এখানে আছি।আমার আশেপাশে কেউই ছিল না।একসময় আমার মনে হতে লাগল আমাকে এখানে বোধহয় সারাজীবন একাই কাটাতে হবে।তাই খুব ভয় করছিল।ভয় পেয়ে কাঁদছিলাম।
মেয়েটি মলিন মুখে কথাগুলো বললো।দেখে রফিকের খুব মায়া লাগল।আহারে বেচারী!সত্যিই বোধহয় অনেক ভয় পেয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ দিন কেটে গেল।দীর্ঘ সময়।এই দীর্ঘ সময়ে রফিক মেয়েটির সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পারল।জানতে পারল মেয়েটির নাম নিশি।জানতে পারল নিশি আগে চশমা ছাড়া সব কিছু অস্পষ্ট দেখত।কিন্তু এখানে আসার পর তার আর চশমা লাগছে না।চশমা ছাড়াই সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।একদিন রফিক দেখতে পেল নিশি মন খারাপ করে বসে আছে।সে নিশির পাশে গিয়ে বসল;বললো,''তোমার কী মন খারাপ?'' নিশি কিছুটা ইতস্তত করে বললো,''নাহ্,মন খারাপ না।"
রফিক||মন খারাপের কারণটা কী আমাকে বলা যায়?
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল;তারপর বললো,''বাবা আর মামণির কথা খুব মনে পড়ছে।আমাকে ছাড়া তারা বোধহয় খুব কষ্টে আছে।জানো,তারা আমাকে অনেক ভালোবাসে।কিন্তু আমি তাদের ভালোবাসার কোনো প্রতিদান দিতে পারলাম না।''
রফিক||ভালোবাসার কী কোনো প্রতিদান হয়?
নিশি||জানি না।তবুও তাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে বড় ইচ্ছে করে।অনেক চেষ্টা করেছিলাম।কিন্তু তাদের কোনো স্বপ্নই পূরণ করতে পারলাম না।
রফিক||তুমি চেষ্টা করেছিলে,তা তো তোমার বাবা-মা জানেন।এতেই তারা অনেক খুশি হবেন।বরং তুমি তাদের কথা চিন্তা করে মন খারাপ করে আছ-জানতে পারলে তারা অনেক কষ্ট পাবেন।এখন তুমিই বল তোমার কি মন খারাপ করে থাকা উচিৎ?
নিশির ঠোটের কোনায় হালকা হাসি ফুটে উঠল।সাথে তার চোখও যেন হাসছে।এই হাসির মাঝে এমন কিছু একটা আছে যা মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়।রফিক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।তার এই মুগ্ধতা শুধুই নিশির জন্য।নীলাকে এখন আর তার মনে পরে না।নীলা বলতে রফিকের জীবনে কেউ ছিল তাই সে ভুলে গিয়েছে।রফিকের এখন এই জীবন অনেক ভালো লাগে।এই জগতের মায়াবী আলো তার ভালো লাগে।সে চোখ বন্ধ করলে নিশিকে দেখতে পায়।দেখতে পায় নিশিকে নিয়ে সে খুব সুন্দর স্বাভাবিক একটি জীবন যাপন করছে।মাঝে মাঝে তুচ্ছ কারণে অভিমান করে একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে এমন একটি জীবন।
নিশি আজকাল রফিককে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।রফিকের কোনো কথারই ঠিক মত জবাব দিচ্ছে না।নিশির এ আচরণে রফিক হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকে।তা দেখে নিশির বড় মায়া লাগে।তবুও তার কিছুই করার নেই।কারন নিশি এমন কেন করছে তা সে নিজেও জানে না।শুধু জানে রফিককে এখন তার সবসময়ই মনে পড়ে।এই অনুভূতিই কী ভালোবাসা?নিশির ধারণা-ভালোবাসা হচ্ছে অনেকটা ভোরের আলোর মত;যা মানুষের জীবনকে রহস্যময় রূপে আলোকিত করে তোলে।রফিককে নিশি যেন তার মনের সব কথা বলতে পারে।হাসি-আনন্দ,দুঃখ-কষ্টের প্রতিটি মূহূর্তে ছায়া হয়ে রফিক তার পাশে থাকবে।একটি মেয়ে কখনও এর চাইতে বেশী কী কিছু চায়?তাহলে কী সে রফিককে তার অনুভূতির কথা বলে দেবে?রফিক যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়?তাহলে তো সে বড় একা হয়ে জাবে।প্রিয়জনদের জীবন থেকে হারিয়ে ফেলার কষ্টটা যে কী তীব্র-তা নিশির চেয়ে ভালো করে কেউই জানে না।নিশি চোখ বন্ধ করে ফেললো।কিছু শীতল বাতাস এসে তাকে স্পর্শ করল।
একটু আগে নিশি যা শুনেছে তা তার বিশ্বাস হতে চাইল না।তার হাত-পা কাঁপছে।শরীর খুব দুর্বল লাগছে।হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।''আমি তোমাকে অন্যায় রকমের ভালোবাসি'' কথাটি এই একটু আগে রফিক তাকে বললো!নাকি সে ভুল শুনেছে?নিশির মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে।খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন।অন্যদিকে,রফিক উৎকন্ঠা নিয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে আছে।মাথা নিচু করে রাখায় নিশির চোখ দেখা যাচ্ছে না।সে ঠোটে ঠোট চেপে দাঁড়িয়ে আছে।রফিক হঠাৎ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো নিশির ঠোট হালকা হালকা কাঁপছে।সাথে ঠোটের নিচে ডান চিবুকের তিলতাও কাঁপছে।নিশি কী কাঁদছে?এই কান্নার দৃশ্যই হয়তবা রফিকের জীবনে দেখা সবচেয়ে সুখকর দৃশ্যের একটি।হঠাৎ কিছু একটা হলো।রফিকের চারপাশটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল।তার সামনে নিশি নেই,কেউই নেই।এক নিশ্ছিদ্র শূণ্যতার মাঝে সে দাঁড়িয়ে আছে।তার দেহে প্রবল ক্লান্তি এসে ভর করল।তার মনে হতে লাগল সে অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
ছেলের সেবা করার জন্য রফিকের মাকে বেশীর ভাগ সময়ই এখন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে।প্রতিনিয়ত তিনি ছেলেকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন।ছেলেও সেই পুষ্টিকর খাবারগুলো ভালোভাবেই খাচ্ছে।কিন্তু খুব একটা বেশী কথা বলছে না।কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিতে চায় না।ছেলের এই আচরণে তিনি খুব একটা ব্যথিত হন না।গভীর মমতায় ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।দীর্ঘ সাত মাস কোমায় থাকার পর ছেলে ফিরে এসেছে এতেই তিনি আল্লাহর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।এর চাইতে বেশী তিনি কিছুই চান না।এখন গভীর রাত।রফিকের মা হাসপাতালে কেবিনের বাইরে বসে আছেন।কেবিনের বিছানায় রফিক চোখ মেলে শুয়ে আছে।চারপাশে যন্ত্রের শব্দ হচ্ছে।কেবিনের বড় জানালাটা রফিক তার মাকে খুলে যেতে বলেছিল।সেই জানালা দিয়েই হালকা বাতাস আসছে।রফিক চোখ বন্ধ করল।তার মনে হচ্ছে নিশি যেন তার পাশে হাত ধরে বসে আছে।কাচের চুড়ির শব্দ হলো।নিশি পরম ভালোবাসার সাথে রফিকের চুল স্পর্শ করল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন